HOME ঐতিহাসিক পটভূমিকা  
| নামের মূল \ ইতিহাস | মুসলিম আগ্রাসনের পূর্বে |ুসলিম আগ্রাসনের পরে |
বর্ধমান রাজ(প্রথম পর্ব) মারাঠা আক্রমণ | বর্ধমান রাজ(২য় পর্ব) |  স্বাধীনতা সংগ্রাম |

নামের মূল
বর্ধমানের ইতিহাস শুরু খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ সন তথা মেসোলিথিক বা প্রস্তর যুগের অন্তিম সময় Burdwan নামটি সংস্কৃত বর্ধমান থেকে ইংরেজ কতৃক প্রদত্ত। গলসি থানা সংলগ্ন "মল্লসরুল" গ্রামে প্রাপ্ত ষষ্ঠ শতকের একটি তাম্রলিপিতে প্রথম নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়।

নামের মূল নিয়ে দুটি মত রয়েছে।প্রথম মতানূযায়ী, নামটি ২৪ তম জৈন তীর্থাঙ্কর বা বর্ধমানস্বামী'র নামানুসারে।জৈন কল্পসূত্রানুসারে,মহাবীর কিছুসময় অস্তিকগ্রামে কাটিয়েছিলেন, যা পরে বর্ধমান নামে পরিচিত হয়।

অন্যমতানুযায়ী, বর্ধমানা অর্থ সম্পন্ন কেন্দ্র। গাঙ্গেয় উপত্যকায় আর্য সভ্যতার বিকাশের সময়ে, উন্নতি এবং সম্পনতার প্রতীক হিসাবে স্থানটি পরিচিত ছিল।

ইতিহাস
১৯৫৪ এবং ১৯৫৭ 'র খননকার্য থেকে দুর্গাপুর থানার বীরভানপুর স্থানে মেসোলিথিক যুগের অস্তিতব পাওয়া যায়।এইসব আবিস্কারগুলি, ১৯৬২-৬৫ তে অজয় উপত্যকায় পান্ডু রাজার ঢিবি(ভেদিয়ার কাছে) এবং অজয়, কুমার এবং কোপাই নদী  উপত্যকার বিভিন্ন স্থানে চালানো খননকার্য থেকে পাওয়া যায়।এই ঢিবি থেকে জানতে পারা যায় যে, সেসময়ের মানুষ পুর্ণ পরিকল্পিত  সড়ক ও পায়ে চলা পথ সহ নগর গডে তুলতে সক্ষম ছিল। তারা মাটির বাড়ীতে বসবাস করত।বাড়িগুলির পলেস্তারা করা দেওয়াল এবং পেটানো ল্যাটেরাইটের তৈরী মেঝে ছিল।জানা ছিল তামার  ব্যবহার।কৃষি এবং ব্যবসা ছিল তাদের অর্থনীতির মূল ভিত্তি।

প্রাচীন বাংলায় বর্ধমান একটি প্রসিদ্ধ স্থান ছিল। ষষ্ঠ শতকের লিপি থেকে বিখ্যাত ভুক্তি হিসাবে বর্ধমানা'র উল্লেখ পাওয়া যায়।এই সময়ে এটি রাধাদেশ বা রাধা নামেও পরিচিত ছিল।রাধা-বর্ধমানা অঞ্চলটি মৌর্য্য সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল।গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পরে,  বাংলায় এক বা একাধিক স্বাধীন রাজ্যের পত্তন হয়।

মুসলিম আগ্রাসনের পূর্বে
খ্রিষ্টীয় তৃতীয় শতকের শেষের দিকে পশ্চিম বাংলায় বর্মন সাম্রাজ্যের সূচনা হয়।সম্ভবত চন্দ্র বর্মন রাধা'র রাজা ছিলেন।এরপর গুপ্ত সাম্রাজ্য ক্ষমতায় আসে এবং বিনয় গুপ্ত অঞ্চলটির শাসনকর্তা হন।এনার পরে শশাঙ্ক বাংলার স্বাধীন শাসক হন ও জয়নাগ এরপর অঞ্চলটির শাসনকর্তা হন।

সপ্তম শতকের মাঝামাঝি থেকে অষ্টম শতকের শেষ অবধি জেলার ইতিহাসের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না।প্রথম গোপালের পুত্র ধর্মপালের খলিমপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, মাৎসান্যায় থেকে দেশকে রক্ষা করতে প্রথম গোপাল রাজা নির্বাচিত হন।পাল বংশের পর সেন বংশ বাংলার শাসনভার হাতে নেন  ১১৩০ খ্রিষ্টাব্দে। দেওপাড়া লিপি অনুযায়ী, বিজয়সেন সেন বংশের প্রথম রাজা।এরপর মুসলিম আগ্রাসনের পূর্বে গোপভূমের সদগোপ বংশ অল্প সময়ের জন্য বর্ধমান শাসন করেন।

মুসলিম আগ্রাসনের পরে
লক্ষণসেনের আমলে প্রথম মুসলিম আক্রমণের ঘটনা ঘটে।আক্রমণকর্তা বখতিয়ার খীলজী।দশ বছর পর,হাস্মুদ্দিন ইওয়াজের শাসনকালে রাধার উত্তরাঞ্চল মুসলিম শাসক লখনৌতি বা গৌড় দ্বারা অধিকৃত হয়।এরপর উড়িষ্যার রাজাদের সাথে মুসলিম শাসকদের অঞ্চলটির অধিকার নিয়ে যুদ্ধ চলে।

সমগ্র বর্ধমান জেলার রাজনৈতিক চিত্রটি তখনও পরিস্কার ছিলনা।তথাপি গাঙ্গেয় অংশটি অবশ্যই লখনৌতি বা গৌড়ের অধীনস্থ ছিল।সপ্তগ্রামে প্রাপ্ত নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহের লিপি থেকে, এই অঞ্চলে  ওনার আধিপত্য প্রমাণিত হয়।এঁর পুত্র, পরবর্তি রাজা রুকনুদ্দিন বরবক শাহ, শ্রীকৃষ্ণবিজয়ের রচয়িতা কবি মালাধর বসুর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।মালাধর বসু জেলার কুলিনগ্রামের বাসিন্দা ছিলেন এবং লখনৌতির রাজার কাছ থেকে গুণরাজ খান উপাধি পান।অপর বিখ্যাত কবি,যিনি সেসময়ে বর্ধমান অলংকৃত করেন,হলেন রূপরাম।ইনি ছিলেন ধর্মমঙ্গলের রচয়িতা।

১৬০৬ এ জাহাঙ্গীরের পালিত ভ্রাতা  কুতুবুদ্দিন খান কোকা, বাংলার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন।সেইসময়ে বর্ধমানের জায়গীরদার বা ফৌজদার ছিলেন, শের আফগান ইস্তাঝী নামক এক তূর্কী।এণার পত্নী মেহেরুন্নিসার রূপবতী হিসাবে খ্যতি ছিল।কুতুবুদ্দিন খান কোকা বাংলায় আসার অল্পদিনের মধ্যেই বর্ধমানে আসেন।শের আফগান এবং কুতুবুদ্দিন খান কোকার মধ্যে যুদ্ধ হয় এবং যুদ্ধে উভয়েরই প্রাণহানি হয়।বর্ধমান শহরে শের আফগান এবং কুতুবুদ্দিন খান কোকার পাশাপাশি সমাধি রয়েছে।মেহেরুন্নিসা জাহাঙ্গীরের পত্নী হন এবং নূরজাহান নামে অলংকৃত হন।

১৬২২ এ দাক্ষিণাত্যে অবস্থানকালে শাহজাদা খুর্‌রম পিতা জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং দাক্ষিণাত্যের বুরহানপুর থেকে তাপ্তী নদী অতিক্রম করে উড়িষ্যার মধ্যে দিয়ে বাংলায় প্রবেশ করে বর্ধমান অধিকার করেন।খুর্‌রম বৈরাম বেগকে বর্ধমান হস্তার্পণ করেন।১৬২৮ এ খুর্‌রম শাহজাহান নাম নিয়ে দিল্লির মসনদে বসেন এবং কাসিম খান জুঈনীকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন।

বর্ধমান রাজ(প্রথম পর্ব)
১৬৫৭ সালে আবু রাই নামক এক বণিক এবং মহাজন, বর্ধমানের রকাবি বাজার এবং মুঘুলটির কোতোয়াল এবং চৌধুরী নিযুক্ত হন।ইনি আদেশমাত্র সৈন্য সরবরাহের জন্য সক্ষম ছিলেন।এনার পিতামহ লাহোরের কোটলিমহল্লার বাসিন্দা সংগ্রাম রাই, পুরী তীর্থযাত্রা করে ফেরার পথে বর্ধমানের কাছে বৈকণ্ঠপুরে বসবাস করতে শুরু করেন।সংগ্রাম রাইএর পুত্র ছিলেন বঙ্কু বিহারী।আবু রাইএর পুত্র বাবু রাই বর্ধমানের জমিদার রাম রাইএর কাছ থেকে বর্ধমান পরগণা এবং আরও তিনটি তালুক অধিকার করেন।এনার পুত্র ঘণশ্যাম রাই এই সম্পত্তির উত্তরাধীকারী হন এবং শ্যাম সাগর নামক বিরাট জলাশয়টি এরই নামানুসারে খনন করা হয়। ১৬৮৯ তে ঔরঙ্গজেবের ফরমান অনুসারে ঘণশ্যাম রাইএর পুত্র কৃষ্ণরাম রাই, দু লাখ মুদ্রা নজরানায় বর্ধমান এবং অন্যান্য কয়েকটি পরগণার জমিদার এবং চৌধুরী নিযুক্ত হন।তিনি কোন প্রকার নতুন কর না প্রয়োগ করতে, কৃষিতে উৎসাহ প্রদান করতে এবং আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আদেশ পান।কৃষ্ণরাম রাই কৃষ্ণসাগর(কৃষ্ণসায়র) নামক জলাশয়টি খনন করেন।

১৬৮৯ সালে ইব্রাহিম খান বাংলার সুবেদার নিযুক্ত হন।এনার দূর্বল প্রশাসন আইন-শৃঙ্খলার বির্পযয়ের কারণ হয়।১৬৯৫ তে বর্তমান পূর্ব মেদিনীপুরের ঘাটাল মহাকুমার,চেতুয়া-বারদার জমিদার শোভা সিং, উড়িষ্যার শাসক জনৈক রহিম খানের সহায়তায়, কৃষ্ণরাম রাইকে আক্রমণ করেন।রাই ১৬৯৬ তে পরাস্ত হন।কৃষ্ণরামের পুত্র জগতরাম রাই পালিয়ে যেতে সক্ষম হন কিন্তু পরিবারের অন্য সব সদস্যকে শোভা সিং বন্দি করেন। পরিবারের বহু নারী বিষ পান করে আত্মহত্যা করেন।

জগতরাম রাই ঢাকায় সুবেদার ইব্রাহিম খানের সাহায্য চান এবং হুগলীর ফৌজদার এবং ডাচদের সহায়তায় বর্ধমান পুণরাধিকার করেন।শোভা সিং কৃষ্ণরামের কন্যা সত্যবতীকে বলপূর্বক হরণের চেষ্টা করলে, সত্যবতী শোভা সিংকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন এবং নিজেও আত্মঘাতী হন। ঔরঙ্গজেব ইব্রাহিম খানকে বরখাস্ত করে পৌত্র আজিম-উস-শান কে নিযুক্ত করেন।আজিম-উস-শান নিজের নামে বর্ধমানে একটি মসজিদ স্থাপন করেন।জগতরাম রাইকে ১৭০২ এ ছলনা করে হত্যা করা হয়।জগতরাম রাই এর জৈষ্ঠ পুত্র কীর্তী চন্দ্র রাই পৈত্রিক জমিদারির উত্তরাধীকারী হন এবং অপর পুত্র মিত্র সেন রাইকে মাসিক  বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়।

কীর্তী চন্দ্র রাই চন্দ্রকোণা এবং বারদার রাজাদের সাথে যুদ্ধ করেন এবং চিতুয়া, ভুরসুত, বারদা এবং মনোহর শাহী পরগনা নিজ জমিদারীর অর্ন্তভুক্ত করেন।কিন্তু এনার সবচেয়ে সাহসী কৃতিত্ন ছিল শক্তিশালী বিষ্ণুপুরের রাজাদের আক্রমন ও পরাস্ত করায়।ইনি কাঞ্চননগর নামক নগরের পত্তন করেন এবং আদেশব্রদীহ নামক জলাশয় খনন করেন। কীর্তী চন্দ্রের মাতার আদেশে রানীসাগর(রানীসায়র) খনন করা হয়।১৭৩৬ এ দিল্লীর সম্রাট মহম্মদ শাহের ফরমানানুসারে কীর্তী চন্দ্র রাই চন্দ্রকোণার জমিদারী লাভ করেন।১৭৪০ এ এনার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারী হন চিত্র সেন।

 মারাঠা আক্রমণ
১৭৪০ এ নাগপুর থেকে ভাস্কর পণ্ডিতের অধীন মারাঠা সৈন্য বাংলায় প্রবেশ করে।আলীবর্দী খান তখন বাংলা-বিহার-উড়িহ্যার নবাব।নবাব, অধীনস্থ উড়িষ্যার শাসক সুজাউদ্দীন কে দমন করার উদ্দেশ্যে উড়িষ্যা যাত্রা করেছিলেন। ফেরার পথে বর্ধমানে ১৭৪২ এর এপ্রিলে মারাঠারা নবাবকে ঘিরে ফেলে।সরবরাহ ও রসদের অভাবে নবাবকে কাটোয়ায় পথে মুর্শিদাবাদ যাবার চেষ্টা করতে হয়।কাটোয়া থেকে ১৪ কিলোমিটার দূরে নিগম সরাজে মারাঠা এবং নবাবের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এবং নবাব কাটোয়া যেতে সক্ষম হন।১৭৪২ এর এপ্রিল থেকে কাটোয়া মারাঠা সেনাবাহিনীর মূখ্য কেন্দ্র হয়ে ওঠে।কার্য্যত ভাগীরথীর পশ্চিমের এই জেলা অস্থায়ীভাবে মারাঠাদের হাতে চলে যায়।

মারাঠারা জেলার অসহায় মানুষদের উপর অবর্ণণীয় অত্যাচার চালায়।বর্ধমানের মহারাজার সভাপণ্ডিত, প্রত্যক্ষ্যদ্রর্শী বাণেশ্বর বিদ্যালংকারের রচনায় এই ঘৃণ্য অত্যাচারের বিবরণ পাওয়া যায়।১৭৪২ এই ভাস্কর পণ্ডিত যখন কাটোয়ায় দূর্গাপুজা পালন করছিলেন, নবাব আলীবর্দী খান কাটোয়ার এক মাইল উত্তরে উদ্ধরণপুরের কাছে গঙ্গা পার হয়ে অকস্মাৎ হামলা করেন এবং মারাঠাদের বাংলা থেকে বিতাড়িত করেন।

১৭৪৩ এর মার্চে, নাগপুরের রাজা রঘুজী ভোঁসলে এবং ভাস্কর পণ্ডিত চৌথ (রাজস্বের এক চতুর্থাংশ) কর আদায়ের জন্য কাটোয়ায় আসেন।মুঘল সম্রাট মারাঠাদের এই কর দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন এবং পেশোয়া বালাজী রাওএর কাছে আলীবর্দী খান বাংলার চৌথ দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিলেন। পরের বছর, মারাঠাদের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য, আলীবর্দী খান ভাস্কর পণ্ডিত এবং তাঁর আধিকারিকদের আমণত্রন জানান এবং হত্যা করেন। ১৭৪৫ এর ডিসেম্বরে রঘুজী ভোঁসলে এবং আলীবর্দী খানের মধ্যে কাটোয়ায় একটি যুদ্ধ হয় এবং রঘুজী পরাজিত হয়ে নাগপুর ফিরে যান।

১৭৪৬ এর নভেম্বরে, আলীবর্দী বর্ধমানে আসেন এবং এক ঘোরতর যুদ্ধে রঘুজীর পুত্র জানোজীকে পরাস্ত করেন।১৭৫১ তে রঘুজী ভোঁসলেে এবং আলীবর্দী খানের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্থাপিত হয়।আলীবর্দী খান রঘুজীকে ১২ লাখ মুদ্রা বাংলার চৌথ হিসাবে দিতে রাজী হন এবং বাংলায় মারাঠা সমস্যার সমাধান হয়।

 

বর্ধমান রাজ(২য় পর্ব)
চিত্র সেন রাই মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে ১৭৪০এ পাওয়া এক ফরমানানুযায়ী রাজা উপাধিতে ভূষিত হন।ইনি কালনার সিদ্ধেশব্রী মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।১৭৪ এ চিত্র সেন নিঃসন্তান অবস্থায় মারা গেলে, এনার তুতো ভাইয়ের পুত্র তিলকচাঁদ উত্তরাধিকারী হন।

তিলকচাঁদও মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে পাওয়া  ফরমানানুযায়ী রাজা উপাধিতে ভূষিত হন এবং কয়েকটি তালুক এনার জমিদারীতে অর্ন্তভুক্ত হয়।১৭৫৫ তে ইনি নিজ জমিদারীর ভিতর কোম্পানীর ব্যবসার উপর কিছু নিষেধনামা জারী করেন কিন্তু আলীবর্দী খান কোম্পানীর পক্ষে রায় দিয়ে বিবাদটির সমাধান করেন।পলাশীর যুদ্ধের পরে, বর্ধমান জেলার খাজনা নবাব মীর জাফর কোম্পানীর কাছে গচ্ছিত রাখেন এবং অবশেষে ১৭৬০ এর সেপ্টেম্বরে নবাব মীর কাশীমের সময় বর্ধমান জেলাটির অধিকার কোম্পানী দখল করে নেয়।

তিলকচাঁদের শাসনকালে কালনা এবং দাইহটে বহু মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়।তিলকচাঁদের মাতা লক্ষীকুমারী কালনায় শ্রী কৃষ্ণ মন্দির স্থাপনা করেন, পত্নী ছাংগাকুমারী কালনায় জগন্নাথ মন্দির স্থাপনা করেন এবং কীর্তীচাঁদের মাতা ব্রজকিশোরী কালনায় বৈকুণ্ঠনাথ শিব মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।কোম্পানী তিলকচাঁদকে অনিয়মিত খাজনা আদায়ের জন্য জমিদারী থেকে বরখাস্ত করার হুমকি দিয়েছিল।প্রকৃতপক্ষে খাজনার পরিমান এত বেশি ছিল যে নিয়মিত আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ে।এরপর বীরভূমের জমিদারের সাথে যুগ্মভাবে তিলকচাঁদ বাঁকা নদীর তীরবর্তী সংগত-গোলার কাছে ২৯ শে ডিসেম্বর ১৭৬০ এ ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হন কিন্তু পরাজিত হন।রাজা ৩৭ বছর বয়েস মারা যান।পুত্র তেজচাঁদ তখন নাবালক।

রানি বিষ্ণুকুমারী ১৭৭৬ থেকে ১৭৭৯ অবধি জমিদারীর ভার চালান এবং তারপর ১৪ বছরের তেজচাঁদের হাতে ভার তুলে দেন।রাজা তেজচাঁদ ১৭৯৩ তে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে ৪০১৫১০৯ মুদ্রা খাজনা এবং অতিরিক্ত ১৯৩৭২১ মুদ্রা পুলবন্দী খরচ দিতে চুক্তিবদ্ধ হন।কিন্তু পশ্চিম বাংলার অন্যান্য জমিদারীর মতই চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে,বর্ধমানের জমিদারীরও ক্ষয় শুরু হয়। ১৭৯৭ তে বোর্ড অফ রেভিন্যু বকেয়া খাজনা আদায়ের নিমিত্ত জমিদারীর বিভিন্ন অংশ বিক্রি করা শুরু করে এবং ফলস্বরূপ বর্ধমানের শক্তিশালী এবং ক্ষমতাবান শাসকগোষ্ঠী বিলুপ্তির সন্মুখীন হয়।

১৮৬৪ তে মহারাজা ভাইসরয়ের লেজিস্লেটিভ কাউস্নিলের অতিরিক্ত সদস্য নিযুক্ত হন। তিনিই ছিলেন প্রথম বাঙালি যিনি এই সম্মান পান।

স্বাধীনতা সংগ্রাম
রাণি ভিক্টোরিয়ার ১৮৫৭ এর সনদ দ্বারা ভারত সরকারের হাতে ভারতের পরিচালনার ভার ন্যস্ত করে।চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দরুণ জমিদারদের উপর নেমে আসা বিপুল পরিমান করের বোঝা কার্য্যত রায়ত(ভারতীয় চাষী)দের উপরই নেমে আসে।১৮৭৮ তে বর্ধমান সঞ্জীবনী রায়তদের স্বার্থ রক্ষার্থে ব্যর্থ সরকারের সমালোচনা করে।গলসী থানার চান্নার যতীন ব্যানার্জী প্রথম স্বাধীনতার জন্য বৈপ্লবিক পন্থার আশ্রয় নেন।কালনা শহরে,শক্তি সমিতি নামক একটি ক্রীড়া সংস্থা স্থাপিত হয় এবং এই সংস্থার সদস্যরা বিদেশী খাদ্য, তামাক এবং মদ্য বর্জনের শপথ নেন।১৯০৮ এ রানীগঞ্জে জয়দেব সেবক সম্প্রাধি নামক একটি অনুরূপ সংস্থা স্থাপিত হয়।

বর্ধমানের মানুষ ১৯০৫ এর বঙ্গভঙ্গ করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।জেলার বিভিন্ন ভাগে সভা আয়োজিত হয়, আসানসোলে ৬০ জন ছাত্রকে বিদ্যালয় থেকে বিতাড়ন করে দেওয়া হয়, বর্ধমান রাজ কলেজের কিছু ছাত্রকে বন্দেমাতরম্‌ ধ্বনি দেবার জন্য বহিস্কার করা হয়।১৯০৮ এ কালনায় একটি জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়।জেলার মুসলিম ধর্মালম্বী মানুষদের মধ্যেও খিলাফত আন্দোলনের প্রভাব বিস্তৃত হয়।১৯২৩ এর ১৮ই মার্চ সমগ্র জেলা ব্যপী হরতাল পালিত হয়।

১৯২৪ এ কালনা পুরসভা নির্বাচনে স্বরাজ পার্টির মনোনীত সদস্যরা দশটির মধ্যে ছয়টি আসনে নির্বাচিত হন এবং কাটোয়ায় অসহযোগ আন্দোলনের নেতা পুরসভার সভাপতিনির্বাচিত হন।১৯৩০ এ গান্ধীজী গ্রেপ্তার হলে,বর্ধমানে ধর্মঘট পালিত হয়।১৯৩১ এর সেপ্টেম্বরে কালনা থানা প্রাঙ্গনে  এবং মেমারীতে এস আই এর বাসস্থলে বোমা ফেলা হয়।সুভাষ চন্দ্র বোস ১৯৩১ এর ডিসেম্বরে বর্ধমানে আসেন এবং একটি সভায় ব্যক্তব রাখেন।

পরিস্থিতি এতটাই প্রতিকূল ছিল যে আসানসোল মহাকুমায় ১৯৩২ এর বেঙ্গল সিকিউরিটি অ্যাক্ট প্রয়োগ করতে হয়।কবি কাজী নজরুল ইসলাম চুরুলিয়ায় জণ্মগ্রহন করেন।কবির রচনা মানুষ্কে স্বাধীনতার জন্য উদ্দীপ্ত করেছিল।১৯৪২ এর ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও বর্ধমানের মানুষ সাড়া দেন।কাশীয়াড়ার পোষ্ট অফিস এবং কালনায় রেল ষ্টেশন পোড়ানো হয়।এভাবেই স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকারে রাজনৈতিক অসন্তোষ প্রকাশ চলতে থাকে।


সূত্রঃ বর্ধমান জেলা গ্যাজেটেরস্‌

| সূচক | ইতিহাস ও প্রেক্ষাপট | ভূগোল | এক নজরে | প্রশাসনিক কেন্দ্রসমূহ | বিধায়কবৃন্দ ও সাংসদবৃন্দ | নির্বাচনী ফলাফল | পর্যটন | ব্লকসমূহ |   সরকারী দপ্তরসমূহ | কৃষি | স্বাস্থ্য | শিক্ষা | তথ্য প্রযুক্তি | খনি | শিল্প | বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব | মানচিত্রসমূহ | ফর্ম | লোক-গণনা সংক্রান্ত তথ্য | পরিসংখ্যানগত তথ্য দূরভাষ নির্দেশিকা | চিত্র সংগ্রহ | বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ | জেলা সংবাদ | নাগরিক পরিষেবামূল্যঞ্জাপণ | আদেশাবল |  

This page is brought to you by
National Informatics Centre(Burdwan District Unit), Department of Information Technology, Ministry of Communications and Information Technology, New Collectorate Building (3rd floor), Burdwan, West Bengal - 713 101, India
Phone : 91-0342-2662582, Email: wbbrd@hub2.nic.in